মার্কিন ইতিহাসের কালো অধ্যায় ‘ট্রাম্পইজম’

0
156

বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রের নানা ধরনের নাম আছে। উন্নয়নের গণতন্ত্র, নিয়মতান্ত্রিক গণতন্ত্র আরো কত কি! এরমধ্যে ট্রাম্পের গণতন্ত্র মার্কিন ইতিহাসের কালো অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে। মূলত ট্রাম্প হচ্ছেন পাগলাটে, মিথ্যাবাদী ও দাম্ভিক-অহঙ্কারী। মিথ্যা, পাগলাটে ও শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ব মনোভাব দিয়ে তিনি আমেরিকাকে দুই মেরুতে বিভক্ত করে ফেলেছেন।

আমেরিকার মতো সাংবিধানিক গণতন্ত্রের দেশে ক্ষমতা না ছাড়ার এমন নিকৃষ্টতম রাজনৈতিক সংস্কৃতি সত্যি আশ্চর্যজনক। উন্নয়নশীল দেশগুলোর মতো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জোর করে ক্ষমতায় থাকার সুযোগ না থাকলেও নির্বাচনের আগেই ট্রাম্প বারবার বলেছিলেন, পরাজিত হলেও তিনি হোয়াইট হাউস ছাড়বেন না। মার্কিন গণতন্ত্রের ট্র্যাডিশনও ভেঙেছেন তিনি। বিজয়ী বাইডেনকে ফোন করে অভিনন্দনও জানাননি। উগ্রপন্থী ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার জনগণ এবং বিশ্ববাসীকে বিভক্ত করেছেন, শ্বেতাঙ্গ উগ্রবাদকে উস্কে দিয়েছেন এবং সংখ্যালঘু ও অভিবাসীদের দমন-পীড়নের হুমকিও দিয়েছিলেন। আর সেই বিভক্তি মারাত্মক আকার ধারণ করে এইবারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে কেন্দ্র করে।

 

নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী বাইডেন জয়ী হলেও পরাজয় মানেননি ট্রাম্প। তার অভিযোগ, ডেমোক্র্যাটরা ভোট কারচুপির মাধ্যমে তার থেকে জয় ছিনিয়ে নিয়েছে। নির্বাচনে পরাজয় না মেনে উল্টো কারচুপির অভিযোগ এনে আদালতে নালিশ করেছিলেন। যদিও এই নালিশে কোনো কাজ হয়নি। নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের জন্য ১৫০ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে ‘খারাপ যুক্তরাষ্ট্র’ রেখে গেলেন ট্রাম্প যেমনটা আর কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টই করে যাননি। ট্রাম্প গত চার বছরে যুক্তরাষ্ট্রকে পুরোপুরি বিপর্যস্ত, দাঙ্গা-সহিংসতায় আকণ্ঠ নিমজ্জিত, করোনাভাইরাস মহামারিতে বিধ্বস্ত এবং বহুধাবিভক্ত করে সৃষ্টি করেছেন। এই চার বছরে সন্ত্রাস-বর্ণবাদ-উগ্রবাদ-চরমপন্থা চরমভাবে বিস্তৃত হয়েছে ‘গণতন্ত্রের বিশ্ব মোড়ল’ যুক্তরাষ্ট্রে। যা বিশ্ব দরবারে গুরুতরভাবে প্রকাশ পায় নতুন বছরের শুরুতে মার্কিন পার্লামেন্ট ক্যাপিটল হিলে সশস্ত্র হামলার মাধ্যমে।

ক্যাপিটলে হামলাকারীদের উসকানি দেওয়ায় ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতায় উসকানি’র অভিযোগও আনা হয়েছিল। এবারসহ এক বছরের মধ্যে দু’বার অভিশংসিত হয়েছেন ট্রাম্প, এখানেও তার রেকর্ড। ট্রাম্প বিদায় নিলেন, কিন্তু তার আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে বেড়ে ওঠা এই উগ্রবাদ ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের জন্য হুমকি হয়ে থাকবে। ৪৫তম মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসাবে শপথ নেওয়ার সময় ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘আমেরিকান হত্যা-ধ্বংসযজ্ঞ’ শেষ করবেন কিন্তু বিশ্ববাসী দেখলো তার উল্টো। আমেরিকানদের স্বপ্ন দেখিয়ে আসা ট্রাম্প আমেরিকার দুঃস্বপ্ন হয়ে ক্ষমতা থেকে বিদায় হয়েছেন । আমেরিকা ফার্স্ট ¯েøাগান তুলে কমপক্ষে ১৫০ বছর পেছনে নিয়ে গেছেন আমেরিকার গণতন্ত্র। জাতীয়তাবাদের ¯েøাগান তুলে শ্বেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গ বৈষম্যে মার্কিন ঐক্যে ফাটল ধরিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগ থেকেই নিজেকে ‘জিনিয়াস’ হিসাবে তুলে ধরতে পছন্দ করতেন ট্রাম্প। ২০১৮ সালে নিজেকে ‘স্মার্ট নয় বরং জিনিয়াস, খুবই জিনিয়াস’ বলেও তুলে ধরেন। তিনি সবসময় বলতেন-তিনি এমন সব কাজ করবেন যা অন্য কোনো প্রেসিডেন্টের পক্ষে সম্ভব হয়নি। আমেরিকানদের হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ চিরতরে বদলে দেবেন।

 

প্রকৃতপক্ষে ট্রাম্প এই কাজগুলো একটাও করতে পারেন নি। বরং বিদায় বেলায় ট্রাম্প দেখলেন মার্কিন রাজধানী ট্রাম্পের হিং¯্র সমর্থকদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সামরিক বাহিনীর ক্যাম্পে পরিণত হয়েছে। ৬ জানুয়ারি ট্রাম্পের অন্ধ সমর্থকরা ক্যাপিটলে তাÐব চালানোর কারণে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের শপথকে সামনে রেখে পুরো ওয়াশিংটন নিরাপত্তা চাদরে ঢাকা ছিল। দেশজুড়েও বাড়তি নিরাপত্তা নিতে হয়েছে। ন্যাশনাল গার্ডের সেনারা অটোমেটিক রাইফেল তাক করে পাহারা দিয়েছেন ওয়াশিংটনের রাস্তা। ট্রাম্প আমেরিকা ও বিশ্ববাসীর জন্য নজিরবিহীন নিরাপত্তা হুমকি ছিলেন। শুধু নিরাপত্তাই নয়, অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তিতে বিশ্বের মহাশক্তিধর এই দেশ বর্তমানে স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় আছে। রাগে-ক্ষোভে বাইডেনের শপথ অনুষ্ঠান থেকে হাজার মাইল দূরে ছিলেন ট্রাম্প। পাগলাটে-ক্ষ্যাপাটে ট্রাম্প হোয়াইট হাউস থেকে বিদায় নিলেও মার্কিন রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কালো অধ্যায় হিসেবে থেকে যাবে ‘ট্রাম্পইজম’।

 

লেখক:
নজরুল ইসলাম ভুঁইয়া

FB Comments

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে