নারীবাদ বনাম গোপন সম্পর্ক

0
153

মাতুব্বর তোফায়েল হোসেন : ক্ষমতাধর কারো সাথে দুর্বল অবস্থানে থাকা নারীর গোপন সম্পর্ক সমাজে অজস্র আপদের উৎপাদন করে। সেটির সঠিক হদিস পাবলিক পায় না। কেননা সম্পর্কটি আড়ালের। চতুর লোকজন কিছুটা আঁচ করে ফেলতে পারলেও সংবেদনশীল বিষয়টি নিয়ে বেশি উচ্চবাচ্য করে না। কারন তার হাতে প্রমাণ নেই। আবার প্রমাণ করার উপায়ও থাকে না। কেননা ক্ষমতাধরের সাথে সবাই তো আর অন্তরঙ্গভাবে মিশতে পারে না। তবে ক্রমাগত নারীটির হম্বিতম্বি-আস্ফালন দেখে এক সময় সবাই বুঝে যায়। একসাথে দুইজন পুরুষ অথবা চারজন নারীর প্রত্যক্ষদর্শীতার মিথ তো আছেই, তার উপর গোপন লোলুপ-প্রবৃত্তি অবদমনের উর্বরভূমিতে সেটি নিয়ে পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখানোর নৈতিক বলটি অধিকাংশের নেই।
এহেন একটি বাস্তবতায় গোপন সম্পর্কটি চলতেই থাকে আর অনবরত উপদ্রবের জন্ম দিতে থাকে। সাধারণগণ পরস্পর ফিসফাস করে প্রতিশোধের যে তৃপ্তি পেতে চায় সেটিও আবর্তিত হয় প্রবৃত্তি প্রশমণের উপায়কে কেন্দ্র করে। ফলে উপদ্রবের উৎপাদন চলতেই থাকে। নারীবাদের দৃষ্টিতে দেখলে মনে হতে পারে, এই ধরনের নারীগণ পুরুষের প্রলোভনের শিকার। এটি একদেশদর্শী ভাবনা। নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে দেখলে নারীটিকে মনে হবে স্রেফ ক্রিমিনাল। কাম-প্রবণতা শুধু পুরুষেরই আছে, এমন তো নয়। বাজার দরে পুরুষতান্ত্রিকতায় নারীর শরীর একটি লোভনীয় বস্তু সন্দেহ নেই। কিন্তু নারীর সম্ভোগ পরিতৃপ্তির জৈবিক তাড়নাটি অদৃশ্য হতে পারে না। উল্লিখিত ধরনের নারী ঠিক এই সুযোগটিই কাজে লাগায়। একসাথে সে দুটি সুবিধা নেয়। প্রথমত ক্ষমতার ভাগ, দ্বিতীয়ত তার জৈবিক পরিতৃপ্তি। অপরদিকে পুরুষ নেয় কেবল একটি সুবিধা। শুধুই সম্ভোগ।
ক্ষমতার উত্তাপে নারীটি বাকুমবাকুম করে সামাজিকভাবে সমীহ আদায় করতে তৎপর থাকে অপরদের কাছ থেকে। একটা শক্ত ভিত্তি পেয়ে এরপর সে মনোযোগ দেয় সম্পদ জড়ো করার দিকে। এই পর্যায়ে কম তীব্রতার দুর্ণীতি উৎসাহিত হয়। দুর্ণীতিটি কম তীব্রতার হলেও এর প্রভাব খুবই মারাত্মক। মাতৃত্ব ও নারীত্ব বিক্রয় হবার সংস্কৃতি-চর্চার বদলে সামাজিক মূল্যবোধের ভয়ংকর অবনমন ঘটে। ঘটনা এখানেই শেষ নয়।
এরপর গোপন সম্পর্কের হাত ধরে আরো কিছু প্রক্রিয়া হাজির হয়। নারীটির প্রতিদ্বন্দ্বী কিংবা শত্রু নাজেহাল হতে থাকে। নারী তার শত্রুকে কথায় কথায় ইভটিজিং, নির্যাতন, এমনকি শ্লীলতাহানির অভিযোগে কুপোকাত করার হুমকি দিয়ে দুর্বল করে ফেলে। তার প্রতিদ্বন্দ্বী সচরাচর পুরুষকেই হতে দেখা যায়। কেননা ক্ষমতার চর্চাটি তো সে করছে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে। পুরুষকে দুর্বল করতে পারার মধ্যে নারীর একটি ঐতিহাসিক মজ্জাগত আমোদ রয়েছে। সেটা এঙ্গেলস কথিত শ্রেণিগত প্রতিশোধ হতে পারে। কিন্তু ব্যাপারটি এখানেও থেমে থাকে না। গোপন সম্পর্কের পুরুষটিও তাকে একই উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে। তার কাছে নারীটি ভোগের সামগ্রী হবার পাশাপাশি অস্ত্র হিসেবেও পরিগণিত হয়। নিজের বৈষয়িক ক্ষমতা-কারবারের বলে শত্রু কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বীকে কুপোকাত করতে না পারলে তখন সে নারীটিকে ব্যবহার করে। এটা মোক্ষম এক আধ্যাত্মিক অস্ত্র!
পুরুষটি যদি নীচ প্রকৃতির হয়, তাহলে তেমনটি সে করবেই। যাকে-তাকে যখন-তখন উচিৎ শিক্ষা দিতে সে ঐ নারীকে উষ্কে দিবে এবং খুব সহজেই তার উদ্দেশ্য সফল হবার আনন্দে শিহরিত হবে। হ্যা এটি একটি পাশবিক আনন্দ। পাশবিক পুরুষ পাশবিক আনন্দই উপভোগ করে। হয়তো সে নারীটিকে বলে দেবে, অমুককে ফাঁদে ফেলো, তমুককে নারী নির্যতনের মামলা করার হুমকি দিয়ে আসো। শেষ পর্যন্ত কাজ না হলে বলবে, থানায় গিয়ে মামলা করে আসো। এই নির্দেশ আধ্যাত্মিক আদেশের মতো কাজ করবে। কেননা নারীটি তার প্রতি কামতাড়িত এবং কৃতজ্ঞ। সম্ভোগ তৃপ্তির পাশাপাশি ক্ষমতার স্বাদটিও সে ভোগ করছে ঐ পুরষটির জন্যই। তাই পুরুষের ভূমিকাটি হয়ে যায় দীক্ষা-গুরুর মত। জীবন দিয়ে হলেও ‘গুরুবাক্য শিরোধার্য’র মত আদেশ পালন করবে সে।
এই ঘটনার আগ পর্যন্ত ক্রিমিনাল শুধু নারীটি। আর পুরুষের উদ্যোগে নারী যখন কাউকে হেনস্থা করতে যায় সেটি দুজনেরই ক্রাইম। এক্ষেত্রে নারীবাদ কপচিয়ে লাভ নেই। ক্রিমিনালদের কোনো নৈতিকতা থাকার কথা নয়। তারা শুধু সমাজের বিভিন্ন ফ্যাক্টরকে ব্যবহার করে। এই ধরনের ক্রাইম সেই সমাজে বিস্তার লাভ করে, যেই সমাজে সার্বিকভাবে অবদমনের বাস্তবতা বিরাজ করে এবং অধিকাংশ মানুষ পুরোনো ধ্যাণ-ধারনা নিয়ে পড়ে থাকে।
একটি সমাজে বহুবিধ গোপন সম্পর্ক থাকতে পারে। সব গোপন সম্পর্কই দুষ্কৃতির পর্যায়ে পড়ে না। থাকতে পারে শুধুই প্রেমের উদ্দেশ্য থেকে কিংবা মহত কোনো উদ্দেশ্য হাসিল করতে গোপন সম্পর্ক। এমনকি স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কটিও এক অর্থে গোপন। কেননা বিছানায় তারা কোনো সাক্ষী রাখে না। এগুলো ক্রাইম নয়।
অপরদিকে উল্টোটিও হয়ে থাকে। কোনো পুরুষ আকৃষ্ট হতে পারে তার চেয়ে ক্ষমতাধর কোনো নারীর প্রতি। কোনো নারীও আকৃষ্ট হতে পারে তার চেয়ে দুর্বল অবস্থানের পুরষের প্রতি। দুর্বল পুরুষের দিক থেকে আকৃষ্ট হবার ব্যাপারটি সম্পত্তির লোভে হয়ে থাকে প্রায়শই। তবে সবল-নারী দুর্বল-পুরুষের প্রতি আকৃষ্ট হয় সচরাচর নিরীহ কামনা-বাসনা থেকেই। সাধারণত ক্ষমতাধর কোনো নারীর সাথে দুর্বল অবস্থানের পুরুষের সম্পর্কটি প্রেমঘটিত হয়ে থাকে। নারী তখন পুরুষটিকে শুধু তার একাকীত্ব ঘুঁচাতে পাশে কামনা করে। নারীবাদকে ব্যবহার করতে চাইলে তার পুরুষের দরকার নেই। সে তো নিজেই নারী!
বহুল প্রচলিত কিন্তু কম কথিত আরেকটি প্রক্রিয়া সমাজ রয়েছে। সেটি হলো উপঢৌকন হিসেবে নারী-দেহ সরবরাহ করা। এটি ভয়ংকর দুষ্কৃতি। আবার ক্ষমতার আশির্বাদ পেতে কিংবা কোনো সুবিধা নিতে স্বামী নিজেই গিয়ে ক্ষমতাধর কারো হাতে আপন স্ত্রীকে সঁপে দিয়ে আসে। এটি স্পষ্টত নারী নির্যাতন। স্ত্রীটি নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে স্বামী নামক পুরুষটির আদেশ পালন করতে গিয়ে নির্মম নিপীড়ণের শিকার হয়।
শুধুই স্বভাবে খারাপ নারী দুষ্কৃতিকারী নয়। বহুগামিতায় অভ্যস্ত হওয়ায় নতুন নতুন পুরুষ সংগ্রহ সে করতেই পারে। এটা ক্রাইম নয়। মহত পুরুষদের সে সম্মান করে এবং শ্রদ্ধা প্রদর্শনও করে। বহুগামিতায় অভ্যস্ত পুরুষের দিক থেকেও এমনটি হয়। আর এটা করতে গিয়ে পুরুষ কখনো কখনো জোর-জবদস্তি করে ফেলে। এই জোর-জবরদস্তি আসে বিরাজমান পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব থেকে। এই জোর-জবরদস্তি আসার আগ পর্যন্ত পুরুষের বহুগামি মানসিকতাজাত কর্মকাণ্ডটিও ক্রাইম নয়। আমরা তো জানিই, সমাজের পবিত্রতা বজায় রেখে স্বেচ্ছায় পরস্পর মিলিত হলে নৈতিকতা ক্ষুণ্ন হয়ে যায় না। আইনেরও ব্যত্যয় ঘটে না। তবে রুচি ও মানসিকতা নিয়ে বিবিধ প্রশ্ন উঠতে পারে। সেই প্রশ্নের সামনে বিবেকবানদের সংযমী হতে দেখা যায়।


লেখকঃ মাতুব্বর তোফায়েল হোসেন

FB Comments

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে