নজরুল এক মহান লড়াকু মানুষ

0
80
নজরুল এক মহান লড়াকু মানুষ
নজরুল এক মহান লড়াকু মানুষ
নজরুল যখন ধূমকেতু কবিতায় বলেন,
“আমি যুগে যুগে আসি, আসিয়াছি পুন মহাবিপ্লব হেতু
এই স্রষ্টার শনি মহাকাল ধূমকেতু!
সাত— সাতশো নরক-জ্বালা জলে মম ললাটে,
মম ধূম-কুণ্ডলী করেছে শিবের ত্রিনয়ন ঘন ঘোলাটে।
আমি অশিব তিক্ত অভিশাপ,
আমি স্রষ্টার বুকে সৃষ্টি-পাপের অনুতাপ-তাপ-হাহাকার—
আর মর্তে সাহারা-গোবি-ছাপ,
আমি অশিব তিক্ত অভিশাপ!”
তখন আক্ষরিক অর্থেই নিজের স্বরূপ তুলে ধরেন।
নজরুল হয়তো সাহিত্যে অমর হতে চাননি। বরং তিনি সাহিত্যকে হাতিয়ার করেছিলেন আজন্ম বঞ্চনার গ্লানি ঘুচাতে কিংবা আমৃত্যু সামাজিক অনাচারের বিরুদ্ধে লড়বেন বলে।
‘আমার কৈফিয়ত’ কবিতায় যখন বলেন,
“বড় কথা বড় ভাব আসেনাক’ মাথায়, বন্ধু, বড় দুখে !
অমর কাব্য তোমরা লিখিও, বন্ধু, যাহারা আছ সুখে !
পরোয়া করি না, বাঁচি বা না-বাঁচি যুগের হুজুগ কেটে গেলে,
মাথার ওপরে জ্বলছেন রবি, রয়েছে সোনার শত ছেলে।
প্রার্থনা ক’রো-যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস,
যেন লেখা হয় আমার রক্ত-লেখায় তাদের সর্বনাশ।”
তখন সরল প্রাণে নিজের মনের কথাই পরিষ্কার করে তোলেন।
তিনি এসব পুঁথি-পুস্তকের ধার ধারেন না। তিনি কেবল প্রয়োজন মত হাতিয়ার তুলে নেন হাতে। কলমকে করেছেন মোক্ষম সেই হাতিয়ার। ইতিহাসে মহাত্মাগণ এই পদ্ধতিতেই তাদের জীবনকে মহাকালের বেদীতে সমর্পণ করেছেন, করে থাকেন। নজরুল তার ব্যতিক্রম হতে পারেননি। আজ সাহিত্যিক নজরুল তথা কবি নজরুলের ঐতিহাসিক মূল্য নির্ধারণ প্রশ্নে এই কথাগুলোই মাথায় আসে আমাদের। এই প্রসঙ্গে কিংবদন্তী চলচ্চিত্র নির্মাতা ঋত্বিক কুমার ঘোটকের একটি উক্তি বিশেষ প্রণিধানযোগ্য–
“আর্ট মানে আমার কাছে যুদ্ধ।”
বঙ্কিম যেমন বলেন, “সাহিত্যের মাধ্যমে দেশসেবা করা না গেলে সাহিত্য চর্চা করতাম না”। মূলত সাহিত্য একটি গভীরতর রাজনৈতিক বিষয়। লেনিন বলেছিলেন, “তলস্তয় হল রাশিয়ান সমাজের দর্পণ”। লেনিন নিশ্চয় তলস্তীয় দর্পণে রাশিয়াকে দেখেছিলেন এবং সফল বিপ্লবের নায়ক হয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও ছিলেন বাঙালি সমাজের দর্পণ। রবীন্দ্র দর্পণে বাঙলাকে দেখে নিয়ে তারপর সফল বিপ্লব করার মত বাংলায় একজন লেনিনের জন্ম হয়নি বলে রবীন্দ্রনাথের রাজনৈতিক সত্ত্বাকে অস্বীকার করার যেমন উপায় নেই তেমনি বাঙালি হিসেবে আমরাও খুব একটা তৃপ্ত হতে পারি না। পরবর্তীতে এই দর্পণে সবচেয়ে ভালো দেখার কাজটি করতে পেরেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
নজরুল সারাজীবন আগুনের চুল্লিতে দগ্ধ হয়েছেন। অসহ্য যন্ত্রণায় সভ্যতা-ভব্যতার সীমা ডিঙ্গিয়ে মুখর হয়েছেন। কখনো কবিতায়, কখনো গদ্যে পুস্তকবদ্ধ হয়ে কিংবা পত্রিকার পৃষ্ঠায় হাজির হয়ে জনতার দৃষ্টিসীমায় বিরাজমান থেকেছেন। আর মানুষকে মুক্তির বার্তা বিতরণ করেছেন।
গান লিখে সুর করে তাতে কন্ঠ দিয়ে সুরের যুদ্ধ করেছেন। পত্রিকা প্রকাশ করে সংবাদযোদ্ধার ভূমিকায় নেমেছেন। চিত্তরঞ্জন দাস ও সুভাষচন্দ্র বসুর স্বরাজ পার্টির সদস্য হিসেবে স্বরাজ দলের প্রার্থী হয়ে ভোটে দাঁড়িয়ে সরাসরি রাজনীতির মাঠে সম্মুখযোদ্ধার ভূমিকা নিয়েছেন। অস্থির সময়ে অস্থির রাজনীতির সক্রিয় চরিত্র কাজী নজরুল ইসলাম। দেশ ও সমাজ থেকে ক্ষুধা-দারিদ্র এবং সকল অনাচার-বৈষম্য দূর করার আমৃত্যু পণ করেছিলেন তিনি। কেননা তিনি এসবের প্রত্যক্ষ শিকার এবং দীর্ঘকালের ভুক্তভোগী। যিনি নিপীড়ণের শিকার হন তিনিই বোঝেন নিপীড়িতের মর্মজ্বালা। নিজের যন্ত্রণাকে সমষ্টির বেদনা হিসেবে মর্মে অনুভব করেছেন। অতপর সবার দুঃখ দূর করার প্রত্যয়ে হাতভর্তি অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধের ময়দানে নেমে পড়লেন। হাতভর্তি অস্ত্রের মধ্যে সাহিত্য নামক অস্ত্রটি বেশি কার্যকর বলে এই অস্ত্রটিকে তিনি সর্বাধিক ব্যবহার করলেন। আর এই সুবাদে নজরুল আমাদের কাছে একজন সাহিত্যিক, একজন কবি হিসেবে পরিচিত হয়ে গেলেন। ধ্রুপদ সমাজে তার সৃষ্টিকর্ম নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলে। নজরুল কতটুকু সফল কবি, কতটুকু সফল ঔপন্যাসিক, কতটুকু সফল গীতিকার কিংবা আরো অন্যান্য। নজরুলকে এভাবে সফল-অসফল-কমসফল হিসেবে উপস্থাপন করার বিপদ হল, এতে করে গোটা ছবিটাই খন্ডিত হয়ে যায়। ধ্রুপদ বিশষজ্ঞরা তাদের ব্যকরণ মেনে কাজ চালাবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু একজন বিরামহীন লড়াকু মানুষ কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের কাছে কেবল বিস্ময় হয়েই আসেন না, নিরন্তর প্রেরণার বাতিঘর হয়ে প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে সদা জ্বলজ্বল করেন।
লেখক –  মাতুব্বর তোফায়েল হোসেন
FB Comments

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে