দীর্ঘ সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকা আগামী প্রজন্মের জন্য হুমকি

0
189
দীর্ঘ সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকা আগামী প্রজন্মের জন্য হুমকি
দীর্ঘ সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকা আগামী প্রজন্মের জন্য হুমকি

অনলাইন ডেস্ক – বাংলাদেশে মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে গত বছরের ১৭ই মার্চ থেকে সাড়ে ১৪ মাসেরও বেশি সময় সব ধরণের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। আগামী ৬ই জুন পর্যন্ত বন্ধ থাকবে, এরপরও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার নিশ্চয়তা নেই।

এতে আমাদের শিক্ষার্থীদের অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে এবং সমাজের মৌলিক ভিত্তি নড়বড়ে হচ্ছে। এভাবে দীর্ঘ সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলে আগামী প্রজন্ম জ্ঞানহীন মূর্খ হবে। সরকার বলছে, সবাইকে টিকা দেওয়ার পরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলবে।

বর্তমান টিকা সংগ্রহের অনিশ্চয়তার কারণে স্বাভাবিকভাবে টিকাদান শেষ হতে দীর্ঘ সময় লাগবে। দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার ফল শিক্ষার্থীদের ওপর বিভিন্ন ধরণের আচরণগত- মানসিক পরিবর্তন লক্ষণীয়। তারা নিয়মতান্ত্রিক জীবনে অনভ্যস্ত হয়ে প্রচন্ড জেদ করছে। একটু বড়রা রুমে আইসোলেটেড হয়ে পরিবারের অন্যদের সাথে দূরত্ব তৈরি করছে। সারাক্ষণই বাসায় থেকে এবং অনলাইন ক্লাসের কারণে শিক্ষার্থীদের মোবাইল এবং ইন্টানেটের প্রতি আসক্তি বহুগুণ বেড়েছে।

ফলে তাদের চোখে সমস্যা, মাথাব্যথা, ঘাড়ে ও পিঠের মেরুদন্ড  ব্যথা হচ্ছে। আবার কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনলাইন ক্লাস করলেও বেশিরভাগই রয়েছে বন্ধ। যার কারণে শিক্ষার্থীরা অনেকটা ঘরবন্দী হয়ে বিরক্ত হয়ে দ্রুত স্কুলে ফিরতে উদগ্রীব। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এ ধরণের আচরণগত পরিবর্তন শিক্ষার্থীদের মহামারি পরবর্তী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুললেও সেখানে অন্য শিক্ষার্থীদের সাথে খাপ খাওয়ানো এবং শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ বজায় রাখা কষ্টকর হবে। অনেকেই তখন স্কুলে যেতে চাইবে না, বন্ধুদের সাথে মেলামেশা এবং সামাজিকীকরণেও এক ধরণের সমস্যা তৈরি হতে পারে। শুধু মানসিক সমস্যা নয়, শিক্ষার্থীদের শারীরিক সমস্যাও বাড়ছে।

শহুরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মুটিয়ে যাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। গ্রামে শিশুরা পুরো শিক্ষা ব্যবস্থা থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। টেলিভিশন-অনলাইনে ক্লাস হলেও প্রান্তিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা মোবাইল, টেলিভিশন বা ইন্টারনেট না থাকায় দূরশিক্ষণের সুযোগ পাচ্ছে না। গত বছর ব্র্যাকের এক জরিপ অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৫৬ শতাংশ শিক্ষার্থী দূরশিক্ষণের বাইরে থেকে যাচ্ছে। আর ইউনিসেফের এক গবেষণা জরিপে দেখা যায়,

মহামারির মধ্যে বিশ্বে মোট শিক্ষার্থীর প্রতি তিনজনে একজন, অর্থাৎ প্রায় সাড়ে ৪৬ কোটি শিশু অনলাইনভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। দীর্ঘদিন স্কুল বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা ভুলে যাচ্ছে। মানসম্মত শিক্ষা ও শিক্ষা প্রদানের দক্ষতা হ্রাস পাচ্ছে।

বড় ঘাটতি নিয়ে ওপরের ক্লাসে উঠছে। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা সেশনজটে পড়ে কর্মজীবনে প্রবেশে পিছিয়ে যাচ্ছে। দরিদ্র শিক্ষার্থীরা ঝরে পড়ছে, শিশুশ্রম-বাল্যবিবাহ বেড়ে যাচ্ছে, শিক্ষার হার কমছে। মানব সম্পদ তৈরি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে সীমিত পরিসরে দেশের সর্বত্র সবকিছুই যথারীতি খুলে দেওয়া হয়েছে। তবে শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে সংক্রমণের বিস্তার কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব? বরং স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিলে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক অবস্থার উন্নতি হবে। টিকা আবিষ্কারের পর এই মহামারি বিদায় নেওয়ার যে আশা করা হয়েছিল, সেটাও এখন আর খুব জোর দিয়ে বলা যাচ্ছে না।

বরং টিকা গ্রহণের পরও অনেকে এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। তাই করোনাভাইরাস যে সহজে বিদায় নিচ্ছে না, তা মোটামুটি অনুমেয়। জাতিসংঘও বলছে, মৌসুমি রোগ হিসেবে এটি পৃথিবীতে থেকে যেতে পারে। সেটা হলে বাংলাদেশেও অল্পবিস্তর করোনা রোগী সব সময় থাকবে। কিন্তু বছরের পর বছর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা সম্ভব না। স্বাস্থ্যবিধি মেনে এক বেঞ্চ পরপর খালি রেখে প্রত্যেক শ্রেণির সপ্তাহে একদিন ক্লাস দিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা রাখা প্রয়োজন। অন্যথায় এ জাতি অন্ধকারে নিমজ্জিত হওয়া স্বল্প সময়ের ব্যপার। জাতির মেরুদÐ ভেঙ্গে পড়লে তা জাতিকে দীর্ঘমেয়াদী ভোগাবে এবং এর পরিণতি হবে অতি ভয়াবহ। আধুনিক সভ্যতার প্রধান ভিত্তির অন্যতম প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। স্কুলের বিকল্প বাড়ি বা অনলাইন ক্লাস হয় না। স্কুল একটি শিশুকে শুধু লেখাপড়াই শেখায় না, সেখানে সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড সামাজিকতা ও খেলাধুলা শেখায়। তাই স্বাস্থাবিধি মেনে অবিলম্বে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালু করা উচিত।

লেখক – নজরুল ইসলাম ভুঁইয়া

FB Comments

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে