ডিজিটাল আইন ও গণমাধ্যমের আক্ষেপ!

0
79

আপনারা জানেন সাংবাদিক তানভির হাসান তানু ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালের করোনা রোগীদেরকে খাবারের বরাদ্দের থেকে তাদের খাবার কম দেওয়ায় ঠিকাদারের একটি অনিয়মের চিত্র সংবাদের মাধ্যমে জনগণের কাছে তুলে ধরেছেন । আর এ কারনে তিনি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে একটি মামলা খেয়েছেন, তাকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছিলো। তাৎকালিক ভাবে ঠাকুরগাও প্রেসক্লাবের সভাপতি সাধারণ সম্পাদক অগ্রণী ভুমিকা পালন করেছেন তাদেরকে সালাম জানাই। সেই রাতেই তারা কর্মরত সকল সংবাদ কর্মীদের একত্রিত করে প্রথমে থানায় যান তার পর গভীর রাতেই মিটিং করে কর্মসুচী পালন করেন।

এই ঘটনায় সাধুবাদ জানাই দেশের সকল মিডিয়া হাউজকে, দেশের সকল ইলেকট্রিক্স,প্রিন্ট ও অনলাইন মিডিয়া যেভাবে ঘটনাটি কাভারেজ করেছেন তাতে কতৃপক্ষের টনক নড়েছে। এতে এটাই প্রমান হয় সংবাদকর্মীরা সাংবাদিকরা যদি একত্রিত হয়ে কাজ করে তাহলে কোন সহকর্মীকে অন্যায় ভাবে সত্য লিখার কারনে কোন অশুভ শক্তিই আমাদের সত্যঘটনা লিখা বা বলা থেকে বিরত রাখতে পারবেনা,এটা আমি মনে প্রানে বিশ্বাস করি।

ঠাকুরগাঁও প্রসক্লাবের নেতাদের সারারাতের পরিশ্রম সফল হয়েছে, আইনি লড়াই আর সত্য তথ্য উপস্হাপনের মাধ্যমে তিনি আদালতের মাধ্যমে জামিনে মুক্তিও পান। তানু ভাইয়ের জামিনে আমরা যতটা খুশী হয়েছি তার চেয়ে বেশী খুশি হয়েছি যে আমরা ঠাকুরগাও জেলার সংবাদিকরা এই কলো আইনের ভিত্তি নড়িয়ে দিতে পেড়েছি,এখন থেকে সত্য সংবাদ লিখার বা বলার কারনে কোন সাংবাদিককে কালো আইনে আটক করে জেল হাজতে পাঠাতে পাড়বেন না। রাষ্ট্রের যারা এই আইন প্রণয়ন করেছেন।তারা হয়তো চমকে গিয়েছে তানুর জামিন দেখে। জয় হয়েছে সাংবাদিকদের, সত্যের জয় হয়েছে। তাই ঐ কর্তাবাবুদের বলতে চাই, “হাত দিয়ে বল সুর্যের আলো রুধিতে পারে কি কেউ কখনও”? এই মামলার বাদী হাসপাতালের তত্বাবধায়ক ডা: নাদিরুল আজিজ চপল। তিনি সাংবাদিক তানভির হাসান তানু সহ জেলার আরও দুই জন সাংবাদিককে এই মামলায় আসামী করেছেন। একজন হলেন আব্দুল লতিফ লিটু ও অপরজন রহিম শুভ।

ঘটনাটি দেশে এবং দেশের বাইরে দেশপ্রেমিক যারা আছেন তাদের মাঝে ব্যপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। জনগণের স্বার্থে একটি অনিয়মের সংবাদ সরবরাহের কারনে একজন নির্ভীক সাংবাদিকের নামে মামলা দিয়ে তাকে হেনস্তা করা, তাকে গ্রেপ্তার করা এবং তার হাতে হাতকড়া পড়িয়ে অসুস্থ্য অবস্থায় হাসপাতালের বেডের সাথে বেঁধে রাখা। সবকিছুই যেনো দানবের দাপুটে আঁকা এক নীল ছকের মতোই মনে হয়েছে দেশবাসীর কাছে। ঘটনাটি সম্পর্কে আমরা কমবেশি সবাই ভেবেছি এবং নানা রকম মন্তব্য করেছি। এ নিয়ে দেশ- বিদেশের অনেক গণমাধ্যম এবং দেশের বিভিন্ন বেসরকারি টেলিভিশনের আয়োজিত টকশোতেও খুব গুরুত্বের সাথে জায়গা পেয়েছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তারের পর জামিনে মুক্তি পাওয়া সাংবাদিক তানভির হাসান তানুর বিষয়টি। তাই এ নিয়ে আমি আমার লিখাটা প্রসস্ত করতে চাইনা। আমি আপনাদের জানাতে চাই একটু অন্যরকম অনুভূতির কথা।

হ্যাঁ ! একজন মফস্বল সাংবাদিক জনগণের পক্ষে লিখতে গিয়ে যখন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলার শীকার হয়। তখন তার অনেক কিছুই হারিয়ে যায়। অনেক মূল্যবান অনুভূতিকে চোখের সামনে জ্বলে পুড়ে ছাই হতে দেখেও আইনের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নিরুপায়ের মতো মেনে নিতে হয় সবকছিু। বুকের ভেতর আস্ত একটা কবর খুরে না রাখলে হয়তো এই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের পাশে বসে সাংবাদিকরা তাদের কলম সত্যের পক্ষ চালাতে পারবেনা। যে কবরে সাংবাদিকরা রাখে, স্ত্রী সন্তানের অসহায়েত্বের আহাজারি, হৃদরোগে আক্রান্ত অসুস্থ্য বাবার হৃৎপিন্ড, কলিজার টুকরো বড় ভাইয়ের দেয়া উপহার আর মায়ের চোখের জলরাশি। এসব কিছুকে উপেক্ষা করেই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের দাবানলে বসে সাংবাদিকরা লিখছে অনবরত। কারন দেশটাকে লুটেরাদের নাগপাশ থেকে রক্ষা করতে হবে। দেশপ্রেমিকদের জানাতে হবে ও দেখাতে হবে লুটেরারা কিভাবে খামচে ধরেছে এই লাল সবুজের পতাকা।

সাংবাদিক তানভির হাসান তানু জামিনে মুক্ত লাভের পর আমি সহ আর কয়েকজন কাছের সহকর্মীরা একসাথে চা খেতে খেতে গল্প করছিলাম। শুনছিলাম তানু ভাইয়ের গ্রেপ্তারের কথা। যদিও গ্রেপ্তারের পর সময়গুলোর স্বাক্ষী আমি নিজেও। নিজেকে সংবাদকর্মী হিসেবে নিযুক্ত করায় তার সাথে গড়ে উঠে আমার বেশ সক্ষতা। আমার চেয়ে তিনি বয়সে বড় এবং পেশাগত দিকদিয়েও বড় হলেও আমাদের সম্পর্কটা একদম বন্ধুর মতোই। কারন তানু ভাই বন্ধুত্বপূর্ণ একজন মানুষ। আমি সাংবাদিকতা পেশায় আসার আগেও আমি তার লেখার ভক্ত। আসুন এবার আসি মূল কথায়।

 

আজ তানু ভাই কিছু আক্ষেপের কথা বলছিলো চা খেতে খেতে- যদিও আমরা আমাদের সমস্যার কথাগুলো একে অপরের সাথে আগেও ভাগাভাগি করেছি তবুও আজ তানু ভাইয়ের কাছে কথাগুলো শুনে যেনো বেশি মাত্রায় নিজেকে অসহায় মনে হচ্ছিলো।

তানু ভাই বলছিলো- মফস্বলে সাংবাদিকতা করি। অফিস থেকে যা ভাতা দেয় তা দিয়ে ডালভাত খেয়ে বেঁচে আছি। করোনা কালে জীবনটা একটু বেশি মানবেতর মনে হচ্ছিলো নিজের কাছে। মাঝে মাঝে মনে হয় সাংবাদিকতা পেশা ছেড়ে দেই। কিন্তু পারিনাহ্। মামলার শীকার হয়ে যখন আমি লোহার শিকের ওপারে বদ্ধ ঘরে তখনও মনে হচ্ছিলো এ পেশাটা ছেড়ে দেই। তথ্য প্রযুক্তি নির্ভর গণমাধ্যমের কারনে একটি স্মার্ট ফোন একজন সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।

মাঝখানে একটি পুরোনো ভাঙ্গা ফোন দিয়েই জনগণের জন্য সংবাদ সংশ্লিষ্ট কাজ করে গেছি। একটি নতুন ফোন কেনার সামর্থও আমার নেই। আমার অবস্থাটা অনুধাবন করে আমার বড় ভাই ঢাকা থেকে একটি স্মার্টফোন পাঠায়। সেটিও জনগণের জন্য লিখতে গিয়ে মামলার শীকার হয়ে হারাতে হলো। আমার ফোনটি নিয়ে নিয়েছে পুলিশ। খবর পেলাম ফোনটা নাকি ফরেনসিক বিভাগে পাঠানো হবে। তখন তানু ভাই একটা কেমন যেনো হাসি দিয়ে নিজের কপালে হাতটা ঠেকিয়ে বললো; হায়রে সাংবাদিকতা !

বর্তমানে তানু ভাই একটি ধার করা স্মার্ট ফোন ব্যবহার করছেন। নাম্বারটিও পরিবারের অন্য কোন সদস্যর। বর্তমানে একটি স্মার্ট ফোন কেনারও সামর্থ নাই তাঁর। তাহলে এমন কঠিন মামলার খরচ কিভাবে চলবে? প্রশ্নটা করার পর তানু ভাইয়ের ছলছল চোখে উত্তর- একদিন সকল সাংবাদিকরা সত্য লিখার কারনে এমন মামলার রোষানলে পড়বে। আর সাংবাদিকতা পেশাটাতে অপসাংবাদিকের দখলদারিত্ব বাড়বে।

তানু ভাইয়ের মায়ের প্রশ্ন হাজার তানুর পক্ষ হয়ে- আমার ছেলে তো কোন অন্যায় করেনি, তাহলে কেনো সে মামলার আসামী হবে? ঠোঁট ফুলিয়ে এক বুক আক্ষেপ নিয়ে বাবার উপদেশ বাবা তুমি সাংবাদিকতা ছেড়ে দিয়ে প্রয়োজনে ইজিবাইক(অটো) চালাও। তানু ভাইয়ের হতাশার প্রশ্ন? সোহেল! সত্যি কথা বলতে কি? একদিন সাংবাদিক তানভীর হাসান তানুকে নিয়ে টকশো, নিউজ কাভার বন্ধ হয়ে যাবে, তৎপরতা কমবে আলোচনার। অন্যকোন ঘটনা ঘটবে মিডিয়ার ফোকাস পড়বে অন্যখানে। কিন্তু ডিজিটাল নিরাপত্তার মতো ভয়ঙ্কর আইনে শীকার হওয়া ভূক্তভোগীরা যা হারায় তা অপূরণীয়। তুবও সাংবাদিকতা করবো। অনিয়ম গুলো তুলে ধরবো। সেই সাথে চিৎকার করে বলবো- মুক্ত চিন্তার উপর বেত্রাঘাত, বাকস্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার গলাটিপে ধরা এই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল কর। এখন সময় সংবাদকর্মী ও জনগণের মধ্যে ব্যপক সমন্বয় ও আইনের অপব্যবহার কারীদের প্রতি ধিক্কার জানানোর।

 

লেখক: সোহেল রানা

সংবাদকর্মী,

ঠাকুরগাঁও।

FB Comments

Leave a Reply