আশা (ছোট গল্প)- পরিনা

0
205
মেয়েটির নাম আশা। কিন্তু নাম আশা হলে কি হবে!? জীবনে তার কোন আশা পূরণ হয়নি বললেই চলে। উদাহরণ হিসেবে কয়েকটি ঘটনা বলি।
আশা জন্মদাতা বাবা মায়ের স্নেহ কোনদিন আশা করেনি। কারন তার জন্মদাতার পরিচয়’ই নেই।
আশা বড় হয়ে যতটুকু শুনেছে এক সন্তানহীন বৃদ্ধ কলা বিক্রেতা আশাকে কুড়িয়ে পেয়েছিলো রেলস্টেশনে। সেই থেকে আশা সেই সন্তানহীন পরিবারেরই আশা। আশাও তাঁদের খুব ভালোবাসে। তাঁরাই আশার বাবা মা।
জন্ম পরিচয়হীন হওয়ার কারনে এবং গরীব ঘরে লালন পালন হওয়ার কারনে হাজারো কটু কথা শুনতে শুনতে বড় হয়েছে আশা। সুন্দর কথা শোনার আশা কোনদিনও আশা করেনি।
আসলে মন তো আর ধনী গরীব বোঝেনা! মন নিজে যা বোঝে তাই করে। মন হলো একনায়কতন্ত্র শাসন ব্যবস্থা। কারোও কথা সে শোনেনা।
আশা যখন কিশোরী তখন দুরন্ত কিশোরী মনের খুব ভালো লাগতো চোখে সানগ্লাস দিয়ে চলাফেরা করা। কিন্তু চোখে সানগ্লাস লাগিয়ে আশা বাহিরে বের হলেই অনেকেই বলতো “ছোটলোকের বেটির ফুটানি কত! চোখে সানগ্লাস! হুম…. বলে মুখ ঝামটা”, সানগ্লাস মাথায় তুলে আশা বাহিরে বের হলেই অনেকেই বলতো, “ছোটলোকের বেটির ফুটানি কত! সানগ্লাস মাথায়! হুম…. বলে মুখ ঝামটা”, সানগ্লাস বুকে ঝুলিয়ে আশা বাহিরে বের হলেই অনেকেই বলতো, “ছোটলোকের বেটির ফুটানি কত! সানগ্লাস বুকে ঝুলানো! হুম…. বলে মুখ ঝামটা।”
তাদের এই অবহেলার মুখ ঝামটা কিশোরী আশার মনে দাগ কাটলো। কিশোরী আশা মনে মনে ভাবতো সানগ্লাস চোখে রাখলে তাদের সমস্যা, মাথায় রাখলে সমস্যা, বুকে রাখলে সমস্যা। আসলে সানগ্লাসটা কোথায় রাখলে তারা খুশি হবে!? সানগ্লাস কোথায় থাকে!? বিতর্ক আর কটু কথা থেকে বাঁচতে মনের দুঃখে আশা সানগ্লাস চোখে দেওয়ার আশা ছেড়ে দিলো কিশোরী বেলায়।
আশা যখন কলেজে ভর্তি হলো তখন আশা জানতে পারলো প্রতি বছর কলেজের ইয়ারচেঞ্জ পরীক্ষায় ১ম থেকে ৫ম পর্যন্ত যারা থাকে তাদেরকে প্রিন্সিপাল স্যার কলেজের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সময় পুরস্কার দেন। আশার খুব ইচ্ছা হলো পুরস্কার পাওয়ার প্রিন্সিপাল স্যারের হাত থেকে। কিন্তু আশার পড়তে ভাল্লাগেনা। আশার শুধু কবিতা, গান লিখতে ভালো লাগে আর জেগে জেগে সুন্দর সুন্দর কল্পনা করতে ভালো লাগে।
আশা কল্পনা করছে, কলেজে অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে সকল শিক্ষক ও ছাত্র/ছাত্রী আছে। সকলের মধ্যে থেকে সেরা পাঁচ জনের মধ্যে আশার নামও আছে। আশার নাম ধরে ডেকে মঞ্চে প্রিন্সিপাল স্যার পুরস্কার দিচ্ছেন। সকলে করতালী দিচ্ছে।
আশার এই কল্পনা পূরণ করার খুব ইচ্ছা হলো। সে কবিতা, গান সব বাদ দিয়ে মনোযোগ দিয়ে পড়তে লাগলো। আশা ভাবলো, এইবারের কল্পনাকে সে বাস্তবে রুপ দিবেই দিবে। ইয়ারচেঞ্জ পরীক্ষাও হলো। অবশেষে রেজাল্টও হলো। আশা তো মহা খুশি। কারন সে ৪র্থ হয়েছে। কিন্তু আশা পরে শুনলো যে, এইবারে নিয়ম হয়েছে ১ম থেকে ৫ম পর্যন্ত নয়, ১ম থেকে ৩য় পর্যন্ত পুরস্কার দেয়া হবে। আশার আশা আর পূরণ হলো না।
আশার অনেক আশা ছিলো পুলিশ হওয়ার। আশার বাবা কলা বিক্রি করতো। গরীব মানুষ। মামার বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার সময় ট্রেনের ভেতরে এক পুলিশের সাথে পরিচয় হয়েছিলো আশার। পুলিশ আশার স্বপ্ন শুনে বলেছিলো, “আমি তো নওগাঁ থাকি। যখন পুলিশে লোক নিবে। তখন নওগাঁতেই লাইনে দাঁড়াতে হয়। তুমি এসো। আমি সহযোগিতা করবো বলে পুলিশটি তার মোবাইল নাম্বারও দিলো কাগজে লিখে। ছোট্ট আশার মনে কত যে আশা জাগলো কথাটা শুনে তা আর লিখে বোঝানো সম্ভব নয়।
কল্পনাতে আশা পুলিশের পোষাক পরে, সানগ্লাস চোখে কতবার যে নিজেকে দেখেছে! কত যে অপরাধীকে ধরেছে আর পিটিয়েছে তার সেই কল্পনার জগতেরও যদি ভিডিও ক্লিপ অন্যকে দেখানো যেত তাহলে সমাজের অর্ধেক অপরাধীই কমে যেতো।
তো যাইহোক, এস, এস, সি পাশের পরে একদিন আশা শুনলো পুলিশে লোক নিবে। আশা তার মায়ের কাছে বায়না ধরলো নওগাঁ যাবে পুলিশে দাঁড়াতে। কিন্তু পাহাড়পুর থেকে নওগাঁ যাতায়াত ভাড়া নেই। আশা মাকে বলল,
“কোন রকম ভাড়াডা দে আম্মা। মুই লম্বা আচো। দাঁড়ালেই মুই পুলিশ হমু। তকন আর তোরে কষ্ট থাকপেনা। প্রতিমাসে মুই তোরগের সব খরচ দেয়া পারমু”
আশার মা আশার কথা শুনে আশা দেখলো নিজেদের কষ্ট দূর হওয়ার। সেই আশা থেকেই ঘরের সম্বল তিন কেজি চাল বিক্রি করে আশাকে ভাড়া দিলো। আর দোয়া দরুদ পড়ে আশার মাথায় হাত দিয়ে দোয়া করে দিলো যেনো আশা পুলিশ হয়। আশা নওগাঁ গেলো। মোবাইলের দোকান থেকে ট্রেনের পরিচিত সেই পুলিশকে ফোন দিলো এবং পরিচয় দিলো। যথা সময়ে তার সাথে দেখাও হলো। সে বলল, “লাইনে দাঁড়াও। দেখতেছি চেষ্টা করে।”
রৌদ্রের মধ্যে লাইনে অনেকক্ষণ দাঁড়ানোর পর আশার সিরিয়াল এলো মাপ নেওয়ার। যেখানে মাপ নিচ্ছিলো সেখানে কিছু দূরে সেই পরিচিত পুলিশও ছিলো। আশার মনে খুব আশা চাকরি হবে। মাপ নেয়ার পরে এক সাইটে দাঁড়াতে বলল। আশা বড় আশা নিয়ে এক সাইটে দাঁড়ালো। কিছুক্ষন পরে পরিচিত সেই পুলিশ এলো। আশাকে ডেকে নিয়ে একটু দূরে গিয়ে বলল, “তোমার সৌভাগ্য যে তুমি আমার পরিচিত। সেই জন্য তোমার জন্য ছাড়! মাত্র তিন লক্ষ টাকা হলেই তোমার চাকরিটা হয়ে যাবে। আশার চোখ তো কপালে ওঠার দশা!
আশা বলল, “আমার পরিবার তিন লক্ষ দূরের কথা তিন হাজার টাকা এক সাথে চোখে দেখেনি এখনও। তিন কেজি চাল বিক্রি করে ভাড়া দিয়ে এসেছি। সম্ভব নয় টাকা দিয়ে চাকরি নেয়ার।”
তারপর আশার আশা ভেঙ্গে গেলো। মায়ের তিন কেজি চাল নষ্ট করার অপরাধবোধ নিয়ে বাড়ি এলো। আশার অক্ষর জ্ঞানহীন মা দৌড়ে এসে বলল, “ক্যা মা চাকরি হচে???? মুই তোর জন্য মেলাগুলা দোয়া করিচু মা।”
আশা মন খারাপ করে বলল, “খালি দোয়ায় কাজ হয় না আম্মা, টাকা লাগে। চাকরি হয়নি।”
সেই থেকে আশা আর পুলিশ হওয়ার আশা করেনি।
এই লেখকের আরও লেখা পড়ুন>>>
আশার বৃদ্ধা বাবা মায়ের কষ্ট দেখে আশা আর্থিক সমস্যার কারনে এইচ, এস, সি পরীক্ষা না দিয়েই লেখাপড়া বাদ দিয়ে কাজের সন্ধানে বের হয় অন্তত মাসের খরচটা যেনো বৃদ্ধা বাবা মাকে দিতে পারে সেই আশায়। শুরু হয় কর্ম যুদ্ধ। একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে খুব সামান্য বেতনে চাকরি হয় আশার। তবু আশার আশা যে বাবা মাকে অন্তত চালের দাম তো দিতে পারবে!! অন্তত মায়ের সেই তিন কেজি চাল বিক্রি করার সময় মাকে দেয়া সেই কথা তো রাখতে পারবে! কিন্তু আশার মনের কোণে অন্তত স্নাতক পাশ করার আশা ঠিকই রয়ে যায়। কিন্ত বাবা মাকে খরচ দিতে গিয়ে আশার শিক্ষা জীবন থেকে ঝরে যায় প্রায় সাত বছর। আশা আর আশাই করেনি যে তার আবার পড়াশুনা হবে।
কিন্তু আল্লাহর আশীর্বাদ হিসেবে আশার জীবনে আশা দেখাতে আসেন মহান আপু। চাকুরি করতে করতে এবং এক রুমে থাকার সৌজন্যে দুজনার পরিচয়। আপুটি আশার সব গল্প শুনে আশাকে নিজের ভাই বোনের চেয়ে বিন্দুমাত্র কম ভালোবাসেনা। বরং নিজের ভাই বোনের চেয়েও বেশিই ভালোবাসে। আপুটি আশাকে বলে, “আজ থেকে আমার সব টাকা তোমার। তোমার বেতনের টাকা তোমার বাবা মাকে দিবে। আর আমার বেতন থেকে আমরা দুজন খাবো। আর তুমি উন্মুক্ততে আবার ভর্তি হয়ে পড়াশুনা করবে।”
আশা সুযোগ পেলেই আশার জাল বোনে। আশা আবার আশা দেখতে লাগলো যে, সে এইচ.এস.সি পাশ করে প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষক হবে। আশা ভর্তি হলো। সন্ধ্যা ৭ টা থেকে সকাল ৭ টা ১২ ঘন্টা নাইট ডিউটি করে আবার দিনের বেলা ক্লাস করে। বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে ছুটি কম, অনেক কষ্ট। শত কষ্টের মাঝেও আশা এইচ.এস.সি পাশ করে। তারপর সালেহা আপুর কথায় ডিগ্রীতেও ভর্তি হয়। চলতে থাকে পড়াশোনা এবং কর্মযুদ্ধ। বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে ১২ ঘন্টা ডিউটি আর কলেজ করে আশার খোঁজও রাখা হয়না কখন কোন সার্কুলার হয়!! বর্তমানে আশা স্নাতক ৩য় বর্ষ। এতদিন স্নাতক ৩য় বর্ষ পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু করোনা এসে আশার আশাকে থামিয়ে দিলো।
এরই মধ্যে প্রাইমারী সার্কুলার হলো। আশা অনেক স্বপ্ন নিয়ে দরখাস্ত করবে ভাবলো। কিন্তু মেয়েদের ক্ষেত্রে এইবারই প্রথম নিয়ম করেছে প্রাইমারী সার্কুলারে দরখাস্ত করতে স্নাতক পাশ লাগবে। আশার আর প্রাইমারীতে দরখাস্ত করা হলো না। হয়তো আর দরখাস্ত করা হবেওনা। কারন মনের কোন বয়স না থাকলেও সরকারী চাকরির বয়স আছে। আর আশার সরকারী চাকরির সেই বয়স পার হয়ে যাবে ২০২১ সালের এপ্রিল মাসের ১০ তারিখে।
বিভিন্ন সমস্যায় এবং করোনার কারনে আশা এক বছরের বেশি হয়ে গেলো বেকার। তবু সালেহা আপু আগলে রেখেছে আশাকে। এরই মধ্যে আবার  বাটপার প্রজেক্ট ব্যবসায়ি শওকত আলীরা করোনাকে পূজী করে বেকার আশাকে স্বপ্ন দেখিয়ে পথে থেকে তুলে এনে নর্দমায় ফেলেছে। রাজশাহী জেলার বাঘা উপজেলার হরিরামপুরের শওকত আলী বিদেশী প্রজেক্টে চাকরি দেওয়ার আশা দেখিয়ে সিকিউরিটি চায় আশার কাছে থেকে। করোনাকালে বেকার আশা কর্মের আশায় ধারদেনা করে সিকিউরিটি দেয়। কিন্তু বাটপার শওকত না দেয় চাকরি, না ফেরত দেয় সিকিউরিটি। করোনা মানে শওকত আলীদের কাছে যেনো শশ্মান ঘাটে আলু পোড়ানোর ধুম লেগেছে।
আশা আইনের সহযোগিতা নেয়। সিকিউরিটি ফেরত দিতে বাধ্য হয় প্রজেক্ট ব্যবসায়ী শওকত আলী। কিন্তু চাকরির আশা আর পূরণ হয় না।
এই সমাজে আশাদের আশা দেখা যেনো মহা পাপ, সততার সাথে বাঁচতে চাওয়া আশাদের অপরাধ!
আশা দৌড়ায় আগে আগে, আর আশারা দৌড়ায় যেনো আশার পেছনে পেছনে। আশাদের এমন হাজারো অপূর্ণ আশা আছে। যার মাত্র কয়েকটা বললাম।
আশা মনের দুঃখে বসে বসে ভাবে সে যদি আত্মাহত্যা করতে ট্রেনের নিচে মাথা দেয়ার জন্য রেললাইনে শুয়ে পড়ে, নির্ঘাত তার উপরে ট্রেন আশার আগেই কিছু দূরে ট্রেনের সব চাকা খুলে যাবে। অটোমেটিক ট্রেন থেমে যাবে। আত্মহত্যার আশাও পূরণ হবেনা আশাদের।
লেখক-
পরিনা
পুঠিয়া রাজশাহী
FB Comments

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে